DUCSU LPR


ইউভাল নোয়া হারারি, স্যাপিয়েন্স; অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব হিম্যানকাইন্ড (হার্পার, ২০১৫) পৃষ্ঠা ৪৬৪, আইএসবিএনঃ ৯৭৮-০০৬২৩১৬০৯৭


Apr 22, 2020

Shares: 15



হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo sapiens) অর্থাৎ আমরা বর্তমান পৃথিবীতে ঈশ্বররূপে বিচরণ করছি। অথচ এক লক্ষ বছর আগে এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে হোমো (Homo) গণভুক্ত (Genus) আরো অন্তত ছয়টি মানব জাতিগোষ্ঠী; হোমো ইরেক্টাস, হোমো নিয়ান্ডার্থালেনসিস, হোমো রুডলফেনসিস। আর আজ সর্বত্র জয়জয়কার আমাদের প্রজাতিটিরই। কিন্তু কেন এবং কিভাবে এই জয় এল?

প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে সমস্ত জীবজগতের মধ্যে Homo Sapiens নামের এই বিশেষ মানব প্রজাতি “সম্মিলিত সংস্কৃতি” নামক এক ধারার সূত্রপাত ঘটায়। কিন্তু আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটে মাত্র ২ লক্ষ বছর আগে। এর আগে হাজার হাজার প্রজন্ম হোমো স্যাপিয়েন্সের বা মানুষের পূর্বপুরুষরা অন্য দশটা প্রাণীর মতই জীবন যাপন করে এসেছে। ইউভাল নোয়া হারারির ভাষায় তখন তারা ছিল “An animal of no significance” অর্থাৎ নিতান্তই সাধারণ একটি প্রাণী। কালের বিবর্তনে আজ তাদের পৃথিবী নামক গ্রহের ঈশ্বর বলা চলে (Animal that became a God)। লেখক এখানে সেই নিতান্তই মূল্যহীন প্রাণীর ঈশ্বর হয়ে ওঠার গল্প বলেছেন তার নিজের ভাষায়, সাবলীল ভঙ্গিতে। আর এই পরিবর্তনের পিছনে তিনি দায়ী করেছেন তিনটি গুরুত্বপূর্ন বিপ্লবকে।

বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব

এই অংশে হোমো স্যাপিয়েন্সের জিরো থেকে হিরো হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়। আগুনের ব্যবহার, ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষমতা, কল্পনা করতে পারার ক্ষমতার মত সামান্য বিষয়গুলো হোমো স্যাপিয়েন্সদের কিভাবে এগিয়ে দিয়েছে তার চমকপ্রদ বর্ণনা স্থান পেয়েছে এই অধ্যায়ে। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব আমাদের যেসব ক্ষমতা দিয়েছিল যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং আশ্চর্যজনক ক্ষমতা হল কল্পনা করার বা গল্প বলার ক্ষমতা। হ্যাঁ! গল্প বলার ক্ষমতাই স্যাপিয়েন্সদের পশু শিকারের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র গোষ্ঠি, বৃহদাকার মানব সংগঠন এবং সামাজিক আচার প্রথার উদ্ভবে সহায়তা করাছে। প্রথমবারের মত মানুষ আফ্রিকার জঙ্গল থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আজকের ফেসবুক, মাক্রোসফটসহ বিভিন্ন কোম্পানিও নিছক মানুষের কল্পনায় বিরাজ করছে। বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব নেই।

কৃষি বিপ্লব

১২ হাজার বছর পূর্বে শুরু হয় কৃষিবিপ্লব। মানুষ যাযাবর আর শিকারী জীবন থেকে ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এযাবৎ কালে কৃষি বিপ্লবকে বিশেষজ্ঞরা মানবজাতির এগিয়ে যাবার এক বিশাল পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিকার করে জীবনধারণকে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং বিপদজনক কাজ মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অধ্যাপক হারারি বলছেন, "The Agricultural Revolution was history’s biggest fraud"। এবার বোধ হয় আপনি একটু নড়েচড়ে বসলেন। আরো একধাপ এগিয়ে হারিরি বলছেন এ কারণে “আমরা গমকে পোষ মানাইনি, বরং গমই আমাদের পোষ মানিয়েছে”। তিনি এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন স্পষ্ট ভাষায়। তবে সাথে স্বীকার করেছেন সেপিয়েন্স প্রজাতির প্রাকৃতিক নির্বাচনে এর ভূমিকা। কৃষিবিপ্লব সেপিয়েন্সের বংশবৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রেখেছিল তার বৈশিষ্ট্যগত কারণে। হারারির ভাষায়:

“The essence of Agricultural revolution is the ability to keep more people alive under worse condition... Just as the economic success of a company is measured only by the number of dollars in its account and not happiness of its employees, so the evolutionary success of a species is measured by the number of copies of its DNA”

কৃষিবিপ্লব হয়ত সেপিয়েন্স প্রজাতিকে আরো অসুখী, আরো ভুখের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু, সেপিয়েন্সের বিবর্তনিক সাফল্যের পেছনে সংখ্যার আধিক্যের অবদানও চোখে পড়ার মতো। ফসলের পরিচর্যার জন্য জমির পাশেই বসতি শুরু করে স্যাপিয়েন্সরা। কৃষি নির্ভর জীবন আমাদের অধিক সময় আর শ্রমের বিনিময়ে নিম্ন পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য উপহার দিয়েছে। উদ্বৃত্ত থাকলেও জীবন মান বাড়েনি। বরং জন্ম হয়েছে অধিক জনসংখ্যা এবং ধনিক-শোষক শ্রেণীর। ইউভাল নোয়া হারারি এটাকে ‘লাক্সারি ট্রাপ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

মানবজাতির ঐক্যতান

কেন একসময়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত শিকারী মানুষগুলো তৈরি করলো শহর, রাজ্য, সভ্যতা? কীভাবে এলো জাতীয়তাবাদ, ধর্ম এবং টাকার ক্ষমতায় বিশ্বাস? মানবতাবাদের ধারণাটাই বা কী? এগুলোই আলোচিত হয়েছে বইটির তৃতীয় অধ্যায় 'The Unification of Humankind'-এ।

তিনি এই অধ্যায়ে মানব জাতির সাফল্যের রহস্যের উন্মোচন করেছেন। হারারি এখানে সেই গল্প বানানো (Myth) এবং তা অন্যকে বিশ্বাস করানোতে সাফল্যের মূলমন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সাথে অপর প্রান্তের মানুষের মিল ছিলো শুধু মানুষ হিসেবেই, আর বাকি চিন্তা-ভাবনা, পোশাক, ভাষা কিংবা ধর্ম বিশ্বাস সবকিছুতেই ছিলো বিস্তর ফারাক। ধর্ম এবং সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার কীভাবে সেই ব্যবধান কমিয়ে এনেছে, কীভাবে বর্তমান বিশ্বের মানুষ এসেছে একক বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের অধীনে- প্রফেসর হারারি তারই গল্প বলেছেন এই অধ্যায়ে।

এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে স্যাপিয়েন্স ধর্মের গল্প বুনেছে, সম্রাজ্যের গল্প বুনেছে। এঁকেছে জাতীয়তাবাদ, দেশ, আইন, ন্যায়বিচার কিংবা সাম্যবাদের গল্প। আর তা অপরকে বিশ্বাস করিয়ে একত্রিত করেছে বিশ্বকে। তাই হায়না শিম্পাঞ্জিদের যদি আমাদের মত গল্প বানানোর এবং অন্যকে বিশ্বাস করানোর ক্ষমতা থাকতো তাহলে হয়ত বিবর্তনের ইতিহাসে আমরা নায়ক না হয়ে খলনায়ক হতাম।

ধর্মের ব্যাপারে তিনি বলেন এটি হবে সর্বজনীন ও প্রচারমুখী। সে বিবেচনায় সোভিয়েত সাম্যবাদও একটি ধর্ম বৈ কম কিছু নয়। কারণ এটি ভবিষ্যদ্বাণী করে, ইতিহাসের শেষ হবে শোষিত শ্রেণীর অনিবার্য বিজয়ের মাধ্যমে। এর আছে নিজস্ব ‘পবিত্র গ্রন্থ’ পুঁজি (Das Kapital), আছে নির্দিষ্ট ছুটি কিংবা উৎসবের দিন, যেমন: পয়লা মে, অক্টোবর বিপ্লব বার্ষিকী। একজন নিবেদিতপ্রাণ সাম্যবাদী তার জীবন দিয়ে হলেও মার্ক্স ও লেনিনের বাণী সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়।

বৈজ্ঞানিক বিপ্লব

বৈজ্ঞানিক বিপ্লবেই সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের। ৫০০ বছর পূর্বে শুরু হওয়া এ বিপ্লব সম্পর্কে আমরা সবাই জানি কমবেশিঃ মানুষ কিভাবে জ্ঞানের শিখরে আরোহন করে বিজ্ঞানের কল্যাণে চাঁদের মাটিতে পদচিহ্ন এঁকেছে, ছুঁয়েছে মঙ্গলের মাটি। তবে ইউভাল নোয়া হারিরি এখানে জ্ঞানের চেয়ে ‘রেভ্যলুশন অব ইগ্নোরেন্স’ কে বেশি গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। প্রফেসর হারারি আধুনিক বিজ্ঞানের তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, যা অর্জন করায় এ বিপ্লব সম্ভব হয়েছে।

১. অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা (The willingness to admit ignorance)

২. পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক বিশ্লেষণকে জ্ঞানের কেন্দ্র বিবেচনা করা (The centrality of observation and mathematics)

৩. নতুন নতুন সক্ষমতা অর্জনের প্রবণতা (The acquisition of new powers)

মূলত ‘স্যাপিয়েন্স’ বইটি লেখা হয়েছে ইতিহাস এবং জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে। বইটির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল এতে ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন কিংবা অর্থনীতি সব কিছুরই মিশ্রণ ঘটেছে কিন্তু লেখক পাঠককে এ জ্ঞানের ভার বুঝতে দেননি। নিতান্তই গল্পের ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন স্বীয় যুক্তি। বইটির মাধ্যমে প্রচলিত বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলার সার্বক্ষণিক চেষ্টা করেছেন জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. ইউভাল নোয়া হারারি। আপনার পছন্দ হতে পারে নাও হতে পারে কিন্তু তা আপনাকে নতুন ভাবনার খোরাক যোগাবে নিশ্চিত।



Tags :




Jashim Uddin is a third year student at the Department of Sociology, University of Dhaka.