DUCSU LPR


ঐশী মামলার রায়ঃ যৌক্তিকতা ও বাস্তবতা


Jun 03, 2020

Shares: 9



২০১৩ সাল। দেশের প্রতিটি পত্র-পত্রিকায় একটি খবরে সয়লাব। নিজ বাসায় পুলিশ কর্মকর্তা ও স্ত্রী খুন। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের পর নিখোঁজ থাকা তাদের মেয়ে ঐশী রহমান নিজেই পুলিশের কাছে অপরাধ স্বীকার করে। এ ঘটনা দেশের বিচার ব্যবস্থাকে বেশ ভালোভাবে নাড়া দেয়। একটা মেয়ে যার বয়স মাত্র উনিশ বছর। সে কিভাবে নিজের বাবা মাকে নিজ হাতে খুন করে? সে কি আসলেই অপরাধী?

অপরাধ নিয়ে ভাবতে গেলেই মনে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগে। যেমন, অপরাধ কী? মানুষ অপরাধ করে কেন? কি তার কারণ? এর পেছনে কি কি কারণ কাজ করে? অপরাধ জিনিসটা সোজা বাংলায় একটি দেশের আইন ব্যবস্থাকে ভঙ্গ করার ফলাফল। প্রতিটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় একাধিক আইন প্রচলিত থাকে। সেগুলো ভঙ্গ করাই অপরাধ।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা অপরাধের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে বেশ কিছু তত্ত্ব দিয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ

১. বায়োলজিক্যাল থিওরি

২. সোশিওলজিক্যাল থিওরি

৩. স্ট্রেইন থিওরি

৪. সোশ্যাল ডিজঅর্গানাইজেশন থিওরি

৫. সাইকোলজিক্যাল থিওরি

৬. কালচারাল ট্রান্সমিশন থিওরি

যুগ যুগ ধরে অপরাধ হয়ে আসছে। সৃষ্টির শুরু থেকেই ভালো ও মন্দ বিষয় দুটো পাশাপাশি প্রবাহিত হয়ে আসছে। এটাই স্বাভাবিক। কোনটা ভালো সেটা আমরা যেমন তুলনা করতে পারি "হ্যাঁ এই জিনিসটা মন্দ" তার সাথে, ঠিক অনুরূপভাবে মন্দ জিনিসটাও আমরা তুলনা করতে পারি ভালো কিছুর সাথে তুলনা করেই।

একজন মানুষ হিসেবে আমরা পরিবারে বেড়ে উঠি কেন? কারণ আমাদেরকে কিছু অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে হয়। পরিবার আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। সেটা ছোটবেলা থেকে "কেন দাঁত দিয়ে নখ কাটা ভালো না” থেকে শুরু করে কেন চাইলেই সারা দিন চকলেট খাওয়া যাবে না” জিনিসগুলো আমরা পরিবার থেকে শিখি।

একজন অপরাধী জন্ম থেকে অপরাধী হয়ে আসে না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে অপরাধ করতে। একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসে বয়ঃসন্ধিকালে। সে সময়টায় পারিবারিক সহায়তা কতটুকু জরুরী সেটার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা পাই ঐশী রহমান মামলায়। ঐশী কেন উশৃঙ্খল জীবন যাপনে জড়িয়ে পড়লো আর কেনই বা সে অল্প বয়সে মাদকের জালে আটকে পড়লো তার পেছনের কারণগুলো খুঁজতে গেলে স্বভাবতই কৈশোরে তার বাবা-মায়ের অসচেতনতা আর বেখেয়ালী মনোভাবগুলোই বেরিয়ে আসবে।

কিন্তু এসব বাদেই, ঐশী রহমান মামলার সম্পূর্ণ রায় (১) পড়লে বোঝা যায় কতটা ঠাণ্ডা মাথায় সে নিজের বাবা মাকে হত্যা করেছে। আপাতদৃষ্টিতে নিজের বেপরোয়া জীবনে বাধা দেওয়াই ছিলো এর মূল কারণ। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, বাবা মায়ের উপর তার ক্ষোভ অনেক দিনের। নিজের মায়ের উপর এগারো বার ছুড়িকাঘাত একটা মানুষ তখনই করে যখন তার উপর দীর্ঘ দিন থেকে জমে থাকে ক্রোধ, ঘৃণা ও হিংসা।

২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ঐশী রহমানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয় ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। সেই রায়ে ঐশীকে মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ডের নির্দেশ দেয়া হয়। দুটি খুনের জন্য পৃথক দুটি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। দুটি অপরাধের জন্য আলাদা আলাদা করে ঐশীকে দুইবার ফাঁসি ও দু’বারে মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। (2)

পরবর্তীতে হাইকোর্ট তার শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও সাথে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদন্ড দেওয়া হয়। রায়ে হাইকোর্ট বলে, ঐশীর অপরাধ মৃত্যুদন্ডের যোগ্য হলেও তার বয়স ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সাজা কমানোর এ রায় দেয়া হয়েছে।

প্রথমে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হলেও পরবর্তীতে যেসব কারণে তার শাস্তি কমিয়ে আনা হয় তা হলোঃ

১. হত্যাকাণ্ডের সময় সে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলো না। মাতাল অবস্থায় ছিলো।

২. শারীরিক ভাবে সে ওভারিয়ান সিস্ট ও শ্বাসনালীতে এজমা তে আক্রান্ত ছিলো।

৩. পারিবারিক ইতিহাসেও তার দাদী ও মামার মানসিক বিকারগ্রস্থতা ছিলো যেটা তার উপর জেনেটিক্যালি সংক্রমিত হয়েছে।

৪. সে নিজেই আত্মসমর্পণ করেছে পুলিশের কাছে এবং কোন প্রকার জোর জবরদস্তি ছাড়াই সমস্ত অপরাধ স্বীকার করেছে।

৫. পূর্বে কোন অপরাধের সাথে সে জড়িত ছিলো না।

অপরাধীর অপরাধ করার পেছনে অনেক কারণ থাকে। কেন সে অপরাধী হয়েছে তার পেছনেও একটা গল্প থাকে। এসব ধারণা থেকেই মূলত ক্রিমিনোলজির পজিটিভ স্কুলের সৃষ্টি। পজিটিভ স্কুল মূলত পাপকে ঘৃণা কর, পাপীকে নয়- এভাবে চিন্তা করে। অন্যদিকে ক্রিমিনোলজির আরেক স্কুল ক্ল্যাসিক্যাল স্কুলের চিন্তা ভাবনা হচ্ছে প্রত্যেকেই তার অপরাধের জন্য শাস্তি ভোগ করবে।

একজন অপরাধীকে ৫ টি উদ্দেশ্যে সাধারণত শাস্তি দেওয়া হয়ঃ

১. ভয়ংকর শাস্তি: অপরাধীকে ভয়ংকর দিয়ে সমাজের অন্য দশজনকে সতর্ক করা বা ভয় দেখানো যে এরকম অপরাধ করলে এমন ভয়ংকর শাস্তি সবারই প্রাপ্য।

২. সমাজ বিচ্ছিন্নতা: নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আটক রেখে অপরাধীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। সোজা বাংলায় জেলে আটকে রেখে তার সামাজিক জীবনযাপন অক্ষম করে দেওয়া।

৩. পুনর্বাসন: বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন পড়াশোনা, কারিগরী শিক্ষা, কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে অপরাধীকে অতীত জীবন থেকে নতুন করে জীবন গঠনের জন্য তৈরি করা।

৪. প্রতিফল: ভিক্টিমের/ভিক্টিমের আপনজনদের ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা অপসারণ করে আদালত কর্তৃক অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান। যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে হয়, অপরাধী তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়ে গিয়েছে। এখন সে আবার নতুন জীবন শুরু করতে পারে। এধরণের শাস্তিতে দেশের আইন ব্যবস্থার উপর মানুষের ভরসা ফিরে আসে।

৫. ক্ষতিপূরণ: অপরাধী কর্তৃক অর্থদণ্ড প্রদান। ভিক্টিমের পরিবারকে অর্থদণ্ড প্রদান করে অপরাধ থেকে দায়মুক্তির প্রচেষ্টা।

একটা সময় ধারণা ছিল একমাত্র ভয়ংকর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ক্রিমিনোলজির ক্ল্যাসিক্যাল স্কুলও তাই বলে। অন্যকে অপরাধ করে ভয়ংকর শাস্তি পেতে দেখে আরেকজনের মাথায় ভয় ঢুকে সেই অপরাধটি না করার। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর সব দেশেই ভয়ংকর শাস্তি তথা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের প্রথা চলে আসছে। বর্তমানে শুধুমাত্র জঘন্য থেকেও জঘন্যতর অপরাধের জন্যই বর্তমানে ফাঁসির আদেশ দিতে বলা হয়ে থাকে। আগামী ৫০ বছর পর বাংলাদেশেও হয়তো সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়ে যাবে। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও খসড়া তৈরি হয়ে গেছে, এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঐশীর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড কি যথেষ্ঠ জঘন্য ও নৃশংস নয়?

ঐশী যে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে সেটা রায় থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায়। সে নিজের মাকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কফি খাইয়ে অচেতন করে ছুরিকাঘাত করে এবং ছুরিকাঘাতের মাঝে তার আহত মা পানি খেতে চায় এবং সে নিজেই মাকে এনে জমজমের পানি খাওয়ায়। তারপর আবার ছুরিকাঘাত করে। সে মোট এগারো বার তার মাকে ছুরিকাঘাত করে। একইভাবে তার বাবাকেও ছুরিকাঘাত করে। তারপর নিজেই ফ্রেঞ্চফ্রাই ভেজে খায়। স্বাভাবিকভাবে ছোট ভাইকে বুঝায় যে তাদের মা অসুস্থ। হাসপাতালে গিয়েছেন।

হত্যাকান্ডের পূর্বে অন্তত দুই বোতল হুইস্কির প্রভাবে তার চিন্তা চেতনা স্বাভাবিক ছিল না বলেছেন মাননীয় হাইকোর্ট যদিও তার কোন ক্লিনিক্যাল প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তাছাড়া তার কাজকর্ম কোনটাই অস্বাভাবিক ছিলো না। সে ঠাণ্ডা মাথায় ঘুমের ওষুধ কিনে এনেছে। সেটা মিশেয়েছে কফির সাথে। তারপর সে নিজের বাবা মাকে হত্যা করেছে। পরবর্তীতে ছোট ভাই ও কাজের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। জবানবন্দী দেওয়ার সময় ও তার মাঝে কোন রকম অনুশোচনার কথা রায়ে ফুটে উঠে নি। বরং আত্মরক্ষার্থে মিথ্যার আশ্রয় ও নিয়েছে শুরুতে।

তাছাড়া প্রথমে তার বয়স স্কুলের কাগজপত্রে উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে তা ১৯ বছর হিসেবে বেড়িয়ে আসে। (৩) আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক কারো অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু মাননীয় আদালত বারবার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটাই বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, সে সবেমাত্র উনিশ বছর পেরিয়েছে। তাদের এ জায়গায় জোর দেওয়ার কারণ, সে মাত্র ১৮ বছর পেরিয়েছে, তার দ্বারা এমন ভুল হতেই পারে। কিন্তু অন্য দশজন মাত্র ১৮ পেরিয়ে আসা কারো সাথে ঐশীর তুলনা করাটা বেশ দূরহ। ঐশী ক্লাস ফোর থেকে ধূমপান শুরু করে। দিনে অন্তত ২০টা সিগারেট তার প্রয়োজন হতো। ক্লাস সিক্স থেকে নিয়মিত গাঁজা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পরে। এসবের জন্য সে বাবার পকেট থেকে টাকাও চুরি করে। তাই মাননীয় আদালতের “সে তো মাত্র ১৯ বছর বয়সে পা দিয়েছে” যুক্তিটি আইনী চিন্তাধারার থেকে মানবিক চিন্তাধারা কর্তৃক বেশি প্রলুব্ধ।

সে পূর্বে কোন ফৌজদারী অপরাধের সাথে জড়িত ছিল না যুক্তিটিও যথেষ্ট দুর্বল। প্রশ্ন থেকে যায়, পুলিশের একজন কর্মকর্তার মেয়ে যদি ১৪ বছর বয়স থেকে মাদকগ্রহণ করে থাকে, সে যদি মাদক চোরাচালান বা অন্য কোন অপরাধের সাথে জড়িতও থাকে সে ক্ষেত্রে সে বিষয়টা ধামাচাপা দেওয়া দেওয়া তেমন কঠিন কি? তাছাড়া সে পূর্বে তিন তিন বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করাও অপরাধ। কিন্তু এ বিষয়টাও তখন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে প্রায় ৩০ বছর অন্তত তাকে জেলে থাকতে হবে। জেল কোডের ৭৬৮ বিধি অনুযায়ী, নিয়মিত সদাচরণ ও নিয়ম কানুন মেনে চললে জেল কর্তৃপক্ষ চাইলে মোট শাস্তির এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে আনতে পারেন। সে হিসেবে তাকে জেলে থাকতে হবে ৩০ বছরের বদলে ২৩ বছর।

স্বাভাবিকভাবেই যদি আমরা চিন্তা করি, ২৩ বছর পর জেল থেকে এই আধুনিক পৃথিবীতে এসে নতুন করে জীবন শুরু করাটা ঐশীর জন্য কি সহজ হবে? তার কোন পরিবার নেই। অতীত ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে সমাজ তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। সমাজের চোখে সে একজন খুনীই হয়ে থাকবে যে নিজের মা বাবাকে হত্যা করেছে।

ঐশী মামলার পরিবর্তিত রায় আমাদের এটাই বুঝায় যে, জঘন্যতম অপরাধের জন্যও আমরা নানান দিক বিবেচনা করে কঠোরতম শাস্তি প্রদান করি না। এমনকি বয়সে পরিণত হওয়ার পরও আমরা আরো বিভিন্ন দিক বিবেচনা করি। আইনী দিকের চেয়েও মানবিক দিকটাই বেশি ফুটে এসেছে এই মামলার পরিবর্তিত রায়ে। মানবিকতা বিবেচনা করে তাকে আবারো আদালত সুযোগ দিয়েছে নতুন জীবন গঠনের। ঐশী কেন এরকম হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে গেলে অবশ্যই তার পরিবারের অসচেতনাতাই ফুটে উঠবে। যার দায়ভার পরবে তার মৃত বাবা মায়ের উপর। কিন্তু ঐশীর ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত অপরাধ কি তাই বলে কোনভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে?

সূত্র

১। রাষ্ট্র বনাম ঐশী রহমান(২০১৭)২ এলএনজে ৩৪৭

২। ‘বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশীর মৃত্যুদণ্ড’ প্রথম আলো (ঢাকা, ১৩ নভেম্বর ২০১৫)

৩। ‘ঐশীর বয়স প্রায় ১৯’ প্রথম আলো (ঢাকা, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩)



Tags :




H.M. Fazle Rabbi is a fourth year student at the Department of Law, University of Dhaka.